
২০১৮ ইন রিভিউ - ক্যারিয়ার, লাইফ এবং ফ্রেন্ডস
২০১৮ সালের জানুয়ারির কোন এক সকালে ঘুম ভাঙ্গলো ফোনের রিংটোনে। আমি সাধারণত মোবাইল মিউট করে ঘুমাতে যাই, সেদিন মিউট করতে মনে ছিল না কেন জানি। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ইউএস এর একটা নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিষ্টি সুরে আমি যেই কোম্পানিতে জব করি সেই কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার বললঃ
দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে কম্পিউটার ডেস্কে চলে আসলাম। মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে, এমনিতেই ডেইলি ১২ ঘণ্টা কাজ করেও কাজ শেষ করতে পারছি না। তারপর আরও কাজ দিলে কঠিন ভাষায় কিছু বলবো। এমনিতে এই কোম্পানিটা অনেক ভালো, প্রচুর কাজ আছে। গত কয়েকবছর আমাকে কাজ খুঁজতে হয় নি, বরং মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে রেস্ট নিতে হয়েছে।
স্ল্যাকে ঢুকে ম্যানেজমেন্ট চ্যানেলে দেখলাম প্রজেক্ট ম্যানেজার, এমডি এবং সিইও অপেক্ষা করছে আমার জন্য। কুশলাদি জিজ্ঞেস করেই বলল, তারা ইন হাউজ ডেভেলপার নিয়োগ করছে। সকল রিমোট ডেভেলপারদের বিদায় নিতে হবে নেক্সট উইক থেকে এবং আমাকে পরবর্তী মাস থেকে আর কোন বিগ প্রজেক্ট দেয়া হবে না। আমি বললাম, টুকটাক কাজের জন্য আমি এই কোম্পানিতে ঝুলে থাকবো না। রানিং প্রজেক্ট শেষ করেই আমি বিদায় নিবো। বলে আমি সোজা বিছানায় চলে এলাম, ঘুমে ঢলে পরছি। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বড় অসহায় লাগলো। আমি বেকার হয়ে গেলাম।

বেকারত্ব দিয়ে শুরু হল আমার ২০১৮। পর্যাপ্ত সেভিংস থাকার কারনে তেমন একটা সমস্যায় পরি নি। পকেটে টাকা আর হাতে অঢেল সময়, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটিভ হয়ে পরলাম। গতবছর থেকেই দারুণ একটা কমিউনিটি "আপওয়ার্ক প্রিমিয়ার ক্লাব" এ যুক্ত হয়েছিলাম। সেই গ্রুপের মাধ্যমে দারুণ কিছু মানুষের সাথে পরিচিত হলাম এবং তাদের সাথে মিশে গেলাম। সেই ভালো মানুষগুলির জন্যই ক্যারিয়ারের এই খারাপ সময়টিকে ভুলে গিয়ে আনন্দে সময় কাটাতে পেরেছি।
তখন জানুয়ারি মাস শেষ হয়নি, ক্লাব থেকে সেইন্ট মারটীন এ ট্যুর দিলাম। সেখানে গিয়ে আনন্দ করার পাশাপাশি, এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে দারুণকিছু উপদেশ পেলাম। সেই উপদেশমত চলার ফল আমি কয়েকমাসের মধ্যেই পেয়েছি। সেই উপদেশগুলি আমি সারাজীবন মনে রাখবো।

সেইন্ট মারটীনেই আমি সুবীর ভাইয়ের সাথে অনেক ক্লোজ হয়ে গিয়েছিলাম। একই এলাকার মানুষ আমরা। অনেকেই ভাবে যে এ জন্য নাকি আমরা বেশী ক্লোজ। কিন্তু আমার মনে হয় এক এলাকার মানুষ এই মিলের থেকেও বড় মিল আমরা একই মন মানুষিকতার মানুষ। আপন ভাইয়ের মত ভালোবাসি তাকে আমি। সুবীর ভাই ২০১৮ সালের সেরা উপহার আমার জন্য।
ধীরে ধীরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত হচ্ছি। সবার ভালোবাসা পাচ্ছি। আমি একটু রসিক এবং মিশুক টাইপের মানুষ। সবার সাথে মিশে যেতে পারি। এজন্যই বাচ্চা থেকে শুরু করে বুইড়া ভাইদের সাথেও অনেক ক্লোজ হয়ে গেলাম।
এদিকে সব সেভিংস ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নিয়ে সিরাজগঞ্জে একটা জমি কিনলাম। এই সময় জমি কেনা ঠিক হয় নি, কারন জমি কেনার পর আমার সেভিংস জিরো হয়ে গেলো। জমি কিনে জমিদার তো ঠিকই হলাম, কিন্তু পকেট ফাকা হয়ে গেলো। তলপেটে শিরশির করতে শুরু করলো।
পকেটে টাকা না থাকলে কোনকিছুই ভালো লাগে না। বাড়িতে ফোন করা কমিয়ে দিলাম। আগে প্রতিদিন ৩-৪ বার ফোন দিতাম বাড়িতে, এখন একবার ফোন দিই। কোনদিন দিই ই না। মাথার মধ্যে প্রচুর প্রেশার ফিল করছি, মাঝে মাঝে চোখে অন্ধকার দেখি। একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, দ্রুত কিছু না করলে আমার লাইফ নষ্ট হয়ে যাবে। আমি ভেঙ্গে পরার জন্য জন্য পৃথিবীতে আসি নি। মার খেতে খেতে পরে যাওয়া নায়ক যেভাবে উঠে দাড়ায়, সেভাবে আমি উঠে দাড়ালাম।
৩-৪ বছর পর কাজ খুঁজছি, কোন প্রজেক্টে এপ্লাই করতে বিরক্ত লাগছে। কিন্তু ঠেলায় পরলে বাঘও নাকি ঘাস খায়, আর আমার তো পকেট খালি। এপ্লাই শুরু করার প্রথম সাপ্তাহেই (মার্চ মাস) বেশ কয়েকটা বাগ ফিক্সিং, সার্ভার ইন্সটলেশনের কাজ পেলাম, আমার প্রিয় কাজ এগুলা। নতুন করে কাজে মনোযোগ দিতে চাইলে প্রিয় কাজগুলি দিয়েই শুরু করা উচিৎ। কাজ করতে থাকলাম, একেরপর এক কাজ করতে থাকলাম। পকেট আবার ভরতে শুরু করেছে আল্লাহর রহমতে। আবার মুখে হাসি ফুটল।
এদিকে আমার জন্মদিন চলে আসলো, কোনদিন জন্মদিন পালন করি নি। ক্লাবের পরিচিত ভাই-ব্রাদারসদেরকে একবেলা খাওয়াতে ইচ্ছা করলো, জন্মদিন পালনের উছিলায় গরীবিহালে নাম-দস্তুর হাল্কা নাস্তা করালাম। বিনিময়ে তারা আমাকে উপহার দিলো আমার লাইফের সেরা জন্মদিন।

জন্মদিন শেষ হয়ে গেলো, আবার কাজে মনযোগী হয়ে গেলাম। একটা বিগ প্রজেক্ট হাতে পেলাম। একটা মেম্বারশিপ বেজড এডুকেশনাল ভিডিও সাইট। রোবটের মত কাজ করতে লাগলাম। অনেকদিন পর হ্যাভিং আ গ্রেট টাইম।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরাঘুরির শখ জাগলো। ঢাকার ভিতরে এবং ঢাকার আসেপাশে প্রচুর ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। আর ফটোগ্রাফি-ভিডিওগ্রাফির নেশাটাও নতুন করে জাগলো। তাই হুট করে Destination Bangladesh নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলে টুকটাক ভিডিও দেয়া শুরু করেছি। এখন ইচ্ছা হয়েছে সারা বাংলাদেশ ঘুরার।
লাইফটা আবার গুছিয়ে নিয়ে এসেছি। অনেক ভালো দিন কাটছে। কাজ, ঘুম, আড্ডা, এই নিয়ে দারুণ সময় কাটছে। বছরটাও শেষেরদিকে। মনে মনে বলছি শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। বছরটা যতটা খারাপ যাবে ভেবেছি, ততটা খারাপ যায় নি।
নভেম্বরে আবার সেইন্ট মার্টিন গেলাম। দারুণ সময় কাটল সেখানে। সারাবছরের ক্লান্তি দুর হয়ে গেলো তিনদিনে। সম্পূর্ণ রিল্যাক্সড হয়ে ঢাকায় ফিরলাম।
২০১৮ সাল আমাকে শিখিয়েছে কখনো ভেঙ্গে না পরতে। বিপদের সময় নিজেকে শক্ত রেখে বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার সঠিক সিধান্ত নিতে পারলে, কোন বিপদই বড় না। সাহস, ইচ্ছা, আর ঠাণ্ডা মাথায় সব বিপদকে দুর করা যায়।
আজ ২৫শে ডিসেম্বর, আমি সিরাজগঞ্জে। কনকনে ঠাণ্ডায় কম্বলের নিচে শুয়ে এই বছরটা ঘেঁটে ঘেঁটে বের করছি কি কি ঘটেছে আমার সাথে। সব কথা পাবলিকলি বলা সম্ভব না। অনেক ভালো কিছু ঘটেছে যা বলা সম্ভব না, আবার অনেক খারাপ কিছুও ঘটেছে আমার সাথে যা বলা সম্ভব না। ওভারঅল আমি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবো না। ২০১৮ সাল আল্লাহ রহমতে ভালোই কেটেছে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আমি নিশ্চিত আমার জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে ২০১৯ সালে, ইনশাহাল্লাহ।
![ফ্রিল্যান্সিং এর টুকরো গল্প [৩] – অন-স্ক্রিন কীবোর্ড দিয়ে প্রোগ্রামিং](/_image?href=https%3A%2F%2Fsolayman.bd%2F_emdash%2Fapi%2Fmedia%2Ffile%2F01M3MSH7JWYK3DFFHZQ5MZZQNH.jpg&w=112&h=112&f=webp&fit=cover&position=center)

![ফ্রিল্যান্সিং এর টুকরো গল্প [২] - সোজা আঙ্গুল ও বাঁকা আঙ্গুল](/_image?href=https%3A%2F%2Fsolayman.bd%2F_emdash%2Fapi%2Fmedia%2Ffile%2F01M3MWKSQ4G2CXKDVXBKSPDGYR.jpeg&w=112&h=112&f=webp&fit=cover&position=center)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনার হোক!