
৪৮ বিলিয়ন ডলারের ডেভিনঃ জুনিয়র ডেভেলপার আর ফ্রিল্যান্সারদের কি হবে?
ডেভিন এর মেকার কগনিশন এখন ৪৮ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। বাংলাদেশের জুনিয়র ডেভেলপার আর ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এর মানে কি, আর কোন স্কিল আপনাকে টিকিয়ে রাখবে।
এআই কোডিং এজেন্ট এখন আর জাস্ট এনাদার টুল না। এটা এখন বিলিয়ন ডলারের বিজনেস।
এই সাপ্তাহে ডেভিন (Devin) এর মেকার কগনিশন (Cognition) সিরিজ ই রাউন্ডে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশী ফান্ড রেইজ করেছে, ভ্যালুয়েশন ৪৮ বিলিয়ন ডলার। মাত্র চার মাস আগে, মে মাসে, অই একই কোম্পানির ভ্যালুয়েশন ছিলো ২৬ বিলিয়ন। চার মাসে প্রায় ডাবল। ঢাকার জমির দামও এতো দ্রুত বাড়ে না ভাই।
খবরটা দেখার পর থেকে ইনবক্সে আর কমেন্টে একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছেঃ "ভাই, প্রোগ্রামিং শিখে কি আর লাভ আছে?" সেটা নিয়েই আজকের ব্লগ লিখতে বসা। আজকে আলোচনা করবো কি হয়েছে, এর মানে কি, আর বাংলাদেশের একজন জুনিয়র ডেভেলপার বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আপনি এখন কি করবেন।
আসলে কি হয়েছে?
আগে ফ্যাক্টগুলো পরিস্কার করে নেই, কারন এই টপিকে গুজব বেশী, তথ্য কম।
- ফান্ডিংঃ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশী, সিরিজ ই। লিড করেছে Andreessen Horowitz আর Accel। আগের ইনভেস্টর Founders Fund, General Catalyst, Avenir ও আছে, সাথে আরো ডজনখানেক বড় ভিসি।
- ভ্যালুয়েশনঃ ৪৮ বিলিয়ন ডলার। মে মাসে ১ বিলিয়ন রেইজ করেছিলো ২৬ বিলিয়ন ভ্যালুয়েশনে।
- রেভিনিউঃ কোম্পানির নিজের দেয়া হিসেবে রান-রেট রেভিনিউ মে মাসের ৪৯২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
- ক্লায়েন্টঃ NVIDIA, GE Aerospace, Citi, Goldman Sachs, Mercedes-Benz এর মতো কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং টিম ডেভিন ইউজ করছে।
যারা রান-রেট জানেন না তাদের জন্য, রান-রেট মানে হলো বর্তমান মাসের (বা সাম্প্রতিক সময়ের) ইনকাম কে বছরের হিসেবে গুন করে দেখানো। এটা অডিট করা বাৎসরিক রেভিনিউ না, একটা প্রজেকশন। সো, ৯০০ মিলিয়ন মানে এই বছর ব্যাংকে ৯০০ মিলিয়ন ঢুকেছে, এমন না।
তবে হ্যা, প্রজেকশন হলেও সংখ্যাটা ছোট না। মাত্র আড়াই বছর আগে, ২০২৪ সালের মার্চে, কগনিশন ডেভিন কে "ওয়ার্ল্ডস ফার্স্ট এআই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার" নামে লঞ্চ করেছিলো। তখন অনেকেই এটাকে হাইপ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলো। মাঝখানে তারা Windsurf নামের এন্টারপ্রাইজ এআই কোডিং প্ল্যাটফর্মটাও কিনে নিয়েছে। আজ সেই "হাইপ" এর পেছনে বড় বড় কোম্পানি টাকা দিচ্ছে, তো নাকি?
ডেভিন জিনিসটা কি?
সহজ কথায় বললে, ডেভিন একটি এআই কোডিং এজেন্ট, যা একটা টাস্ক নিয়ে নিজে প্ল্যান করে, কোড লেখে, টেস্ট করে, আর প্রজেক্টের একটা অংশ কম হিউম্যান ইন্টারভেনশনে শেষ করে দেয়।
ChatGPT বা অটোকমপ্লিট এর সাথে পার্থক্য টা বুঝতে একটা উদাহরন দেই। অটোকমপ্লিট হলো রিকশার বেল, আপনি চালাচ্ছেন, সে শুধু টুং টাং করে হেল্প করছে। চ্যাটবট হলো রাস্তা চেনা সহযাত্রী, জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কোন গলি দিয়ে যেতে হবে। আর এজেন্ট হলো এমন ড্রাইভার যাকে ঠিকানা দিয়ে আপনি পেছনের সিটে বসে চা খান। পৌছে দিবে, কিন্তু ভুল গলিতে ঢুকলো কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব এখনো আপনার।
কগনিশন নিজেই তাদের স্টেটমেন্টে বলেছে, তারা বিশ্বাস করে ইঞ্জিনিয়ারদের উচিৎ আর্কিটেক্টের মতো কাজ করা, আর এক্সিকিউশন টা "সোয়ার্ম অফ এজেন্টস" এর কাছে ডেলিগেট করা। এই লাইনটা খেয়াল করে পড়ুন। পুরো ব্লগের আসল কথা এখানেই লুকানো আছে।
জুনিয়র ডেভেলপারদের জন্য এর মানে কি?
লেট মি মেক সামথিং ক্লিয়ার, আমি আপনাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিবো না।
একজন জুনিয়র ডেভেলপার কে সাধারনত যেসব কাজ দেয়া হতো, যেমন সিম্পল সিআরইউডি (CRUD) পেজ বানানো, একটা বাগ ফিক্স করা, পুরনো কোড একটু রিফ্যাক্টর করা, টেস্ট লেখা, এগুলোই এজেন্ট রা সবচেয়ে ভালো পারে। কারন এগুলোর ইনস্ট্রাকশন পরিস্কার, রেজাল্ট মাপা যায়। সো, একটা কোম্পানি যখন ভাবে "৫ জন জুনিয়র লাগবে নাকি ২ জন সিনিয়র আর কয়েকটা এজেন্ট লাগবে", হিসাবটা জুনিয়রদের পক্ষে সবসময় যাবে না।
এখন বলতে পারেন, তাহলে কি জুনিয়রদের দিন শেষ? ভাই, না।
আমি বলছি না যে কিছুই বদলাবে না। আমি এটাই বলতে চাচ্ছি যে এন্ট্রি লেভেলের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। আগে "লেখতে পারি" ছিলো এন্ট্রি টিকেট। এখন এন্ট্রি টিকেট হলো "রিভিউ করতে পারি, বুঝতে পারি, ঠিক জিনিস টা বানাতে পারি"। আর একটা কথা ভুলে যাবেন না, আজকের প্রতিটা সিনিয়র কোনদিন জুনিয়র ছিলো। কোম্পানিগুলো যদি জুনিয়র নেয়াই বন্ধ করে দেয়, পাঁচ বছর পর এজেন্ট গুলো কে সামলাবে কে?
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এর মানে কি?
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটের একটা বড় অংশ চলে ছোট ছোট টাস্কের উপর। একটা ল্যান্ডিং পেজ, একটা ওয়ার্ডপ্রেস থিম কাস্টমাইজ, একটা স্ক্রিপ্ট, একটা এপিআই ইন্টিগ্রেশন। খুব সহজ মনে হচ্ছে না? সমস্যাটা ঠিক এখানেই। যে কাজ টা আপনার কাছে সহজ, ক্লায়েন্টের কাছে এখন সেটা আরো সহজ, কারন তার হাতেও এখন এজেন্ট আছে।
এর মানে দুইটা জিনিসঃ
১. "শুধু কোড লেখা" টাইপের ছোট কাজের রেট আরো চাপে পরবে। ৫ ডলারে লোগো বানানোর মার্কেটের মতো একটা অবস্থা হতে পারে কোডিং এর নিচের স্তরে।
২. কিন্তু উল্টো দিকে, যে ক্লায়েন্ট এজেন্ট দিয়ে নিজে বানাতে গিয়ে আধা-খেচড়া একটা জিনিস দাড় করিয়েছে, তার এখন এমন একজন দরকার যে জিনিস টা ঠিক করে দিবে, সিকিউর করবে, প্রোডাকশনে নিয়ে যাবে। এই ক্লায়েন্টরা বাড়ছে, কমছে না।
সহজ কথায়, ফ্রিল্যান্সিং এর মাছের বাজারে ছোট মাছের দাম কমবে। বাট যে মাছ কাটা-বাছা সহ রান্না করে দিতে পারে, তার কদর বাড়বে।
কোন স্কিল আপনাকে টিকিয়ে রাখবে?
এবার আসি আসল কথায়। স্কিল ইজ দ্য কিং, এটা আগেও সত্যি ছিলো, এখনো সত্যি। শুধু কিং এর চেহারা টা বদলেছে।
- ফান্ডামেন্টালসঃ ডেটা স্ট্রাকচার, এইচটিটিপি (HTTP), ডাটাবেজ, অথেন্টিকেশন কিভাবে কাজ করে, এগুলো না বুঝলে এজেন্ট এর ভুল ধরবেন কিভাবে? এজেন্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল কোড লেখে। যে ফান্ডামেন্টাল জানে না, সে সেই ভুল কোড খুশিমনে প্রোডাকশনে পুশ করে দেয়।
- কোড রিভিউ আর ডিবাগিংঃ এখন কোড লেখার চেয়ে কোড পড়ার স্কিল বেশী গুরুত্বপুর্ন। অন্যের লেখা (মানুষ হোক বা এজেন্ট) কোড পড়ে বুঝতে পারা, বাগ খুজে বের করা, এটাই নতুন সুপারপাওয়ার।
- সিস্টেম ডিজাইনঃ কগনিশন যেটা বলছে, "আর্কিটেক্টের মতো কাজ করা", এটার মানে হলো কোন জিনিস কোথায় বসবে, কোন ডাটাবেজ, কোন সার্ভিস কার সাথে কথা বলবে, স্কেল হলে কি হবে, এই সিদ্ধান্ত গুলো নেয়া। এজেন্ট ইট গাথে, নকশা টা আপনাকেই করতে হবে।
- সিকিউরিটিঃ এজেন্ট যত কোড বানাবে, তত বেশী কোড রিভিউ করতে হবে সিকিউরিটির দিক থেকে। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, ডেভিন নিজেই এখন সিকিউরিটি আর ইনসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশনের জন্য আলাদা ফিচার আনছে। সো, এই যায়গায় চাহিদা আছে এটা পরিস্কার।
- প্রবলেম বুঝা আর কমিউনিকেশনঃ ক্লায়েন্ট আসলে কি চায়, সেটা বের করা এখনো কোন এজেন্ট আপনার হয়ে করে দিবে না। মিস্টার নেভার এন্ড টাইপের ক্লায়েন্ট কে সামলানো, স্কোপ ঠিক করা, ইংরেজিতে পরিস্কার করে লেখা, এগুলো এখন টেকনিক্যাল স্কিলের মতোই দামি।
- এজেন্ট চালানোর স্কিলঃ হ্যা, এটাও একটা স্কিল। টাস্ক কে ছোট ছোট পরিস্কার ভাগে ভাঙ্গা, ঠিকমতো কনটেক্সট দেয়া, আউটপুট যাচাই করা। যে এজেন্ট কে ভালো ইনস্ট্রাকশন দিতে পারে, সে একা একটা ছোট টিমের কাজ করতে পারে।
- ডোমেইন নলেজঃ শুধু "রিয়েক্ট পারি" না, "হেলথকেয়ার এর ফর্ম আর কমপ্লায়েন্স বুঝি" বা "ই-কমার্সের পেমেন্ট ফ্লো বুঝি"। নির্দিস্ট একটা ইন্ডাস্ট্রি বুঝলে আপনি কোডার না, সলিউশন প্রোভাইডার।
বাংলাদেশ থেকে আমরা কি করতে পারি?
আমাদের একটা এডভান্টেজ আছে, আর একটা ড্রব্যাক আছে।
এডভান্টেজ টা হলো, আমরা সবসময় কম রিসোর্সে বেশী কাজ করে অভ্যস্ত। এজেন্ট টুল গুলোর অনেকগুলোর ফ্রি বা সস্তা প্ল্যান আছে, ইন্টারনেট থাকলেই শেখা যায়। একজন ফ্রিল্যান্সার এজেন্ট ইউজ করে আগে যেটা ১ সাপ্তাহে করতো, সেটা অনেক কম সময়ে ডেলিভার করতে পারে। এতে আপনি একই সময়ে বেশী প্রজেক্ট নিতে পারবেন, অথবা একই প্রজেক্টে বেশী কোয়ালিটি দিতে পারবেন।
ড্রব্যাক টা হলো, আমরা অনেকে এখনো "শর্টকাট" খুজি। কোর্স কিনি, সার্টিফিকেট নেই, কিন্তু বেসিক বুঝি না। এজেন্ট এর যুগে এই শর্টকাট আরো বিপজ্জনক। কারন যেই শর্টকাট আপনি নিচ্ছেন, অই একই শর্টকাট এখন ক্লায়েন্টও নিতে পারে, ফ্রি তে।
আমি সাজেস্ট করবো তিনটা কাজঃ
১. প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় এজেন্ট ছাড়া কোড লেখেন, যাতে মাথা টা ঝং না ধরে।
২. যেকোন একটা এজেন্ট টুল দিয়ে একটা ছোট কিন্তু পুরো প্রজেক্ট শেষ করেন, আর প্রতিটা লাইন রিভিউ করেন। দেখবেন কোথায় সে ভুল করে।
৩. পোর্টফোলিওতে শুধু "কি বানিয়েছি" না, "কেন এভাবে বানিয়েছি" সেটা লেখেন। ক্লায়েন্ট এখন কোড না, চিন্তা টা কিনে।
উপসংহারঃ
কগনিশন এর ৪৮ বিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশন একটা জিনিস পরিস্কার করে দিয়েছে, এআই কোডিং এজেন্ট এখন আর এক্সপেরিমেন্ট না, এটা ইন্ডাস্ট্রির মেইনস্ট্রিম। এটা বাবল কিনা, এই ভ্যালুয়েশন টিকবে কিনা, শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। ভ্যালুয়েশন আর রান-রেট দুটোই ভবিষ্যতের উপর বাজি।
কিন্তু, একটা জিনিস নিশ্চিত। যে ডেভেলপার শুধু টাইপ করে, তার যায়গা ছোট হচ্ছে। আর যে ডেভেলপার চিন্তা করে, বুঝে, রিভিউ করে, আর এজেন্ট কে কাজে লাগায়, তার যায়গা আরো বড় হচ্ছে। ঠেলায় পরলে বাঘও নাকি ঘাস খায়, আমাদেরকেও নতুন খাবার শিখতে হবে। ভয় পেয়ে বসে থাকলে না, শিখতে থাকলে ইনশাআল্লাহ রাস্তা বের হবেই।
তাই এক্সপ্লোর করা থামাবেন না, থামলেই মুখ থুবরে পরবেন। ভুল-ভ্রান্তি নিজগুনে ক্ষমা করবেন। প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট সেকশন ২৪ ঘন্টা খোলা আছে।
হ্যাপী লার্নিং।



এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনার হোক!