২ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেলো, তবুও SaaS টিকে আছে কিভাবে?

২ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে গেলো, তবুও SaaS টিকে আছে কিভাবে?

ফেব্রুয়ারিতে এআই এজেন্টের ভয়ে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া, অক্টোবরে আবার সর্বোচ্চে। SaaS মরছে না, মরছে পার সিট মডেল।

ফেব্রুয়ারিতে সবাই SaaS এর জানাজা পড়ে ফেলছিলো। এক্স, লিংকডইন, ইউটিউব, যেখানেই যাই একই কথা, "SaaS ইজ ডেড"। অক্টোবরে এসে দেখা গেলো, লাশ উঠে দাড়িয়ে চা খাচ্ছে। হাহা।

মজা না, সত্যি। যে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর শেয়ার বছরের শুরুতে মাটিতে মিশে গেছিলো, অক্টোবরের শুরুতে তারা আবার এই বছরের সর্বোচ্চ পয়েন্টে। তাহলে মাঝখানে হলো টা কি? SaaS কি আসলেই মরছে, নাকি জাস্ট খোলস পাল্টাচ্ছে? আর আমরা যারা প্রোডাক্ট বানাই, ক্লায়েন্টের জন্য সফটওয়্যার বানাই, আমাদের জন্য এর মানে কি? সেটা নিয়েই আজকের ব্লগ লিখতে বসা।

ডিসক্লেইমারঃ আমি শেয়ার মার্কেটের লোক না, কোন ইনভেস্টমেন্ট এডভাইসও দিচ্ছি না। একজন ডেভেলপার আর প্রোডাক্ট বিল্ডার হিসেবে ব্যাপারটা যেভাবে দেখছি, সেটাই শেয়ার করছি।

SaaS আর "পার সিট" মডেল কি?

যারা SaaS কি জানেন না তাদের জন্য, SaaS মানে Software as a Service। সফটওয়্যার কিনে কম্পিউটারে ইন্সটল করার দিন শেষ, এখন মাসে মাসে বা বছরে বছরে ভাড়া দিয়ে ইউজ করেন। Slack, Jira, HubSpot, Salesforce, Notion, সবই SaaS।

এবার আসি পার সিট মডেলে। বেশীরভাগ SaaS কোম্পানি টাকা নেয় ইউজার গুনে। আপনার অফিসে ২০ জন Jira ইউজ করে, ২০টা সিটের টাকা দিবেন। ৫০ জন হলে ৫০টা। সহজ কথায় বললে, অফিসের প্রতিটা চেয়ারের জন্য আলাদা ভাড়া। চেয়ারে মানুষ বেশী, কোম্পানির ইঙ্কাম বেশী।

গত বিশ বছর এই মডেল দারুন চলেছে। কারন কোম্পানি বড় হলে লোক বাড়ে, লোক বাড়লে সিট বাড়ে, সিট বাড়লে SaaS কোম্পানির রেভিনিউ অটোমেটিক বাড়ে। প্যাসিভ ইঙ্কামের বাপ।

সমস্যা শুরু হলো যখন চেয়ারে মানুষের বদলে এআই বসা শুরু করলো।

ফেব্রুয়ারিতে কি হয়েছিলো?

২০২৬ এর ফেব্রুয়ারির শুরুতে এনথ্রপিক (Anthropic) তাদের Claude Cowork এজেন্টের জন্য কিছু প্লাগিন ছাড়ে। এগুলো লিগ্যাল, সেলস, মার্কেটিং, ডাটা এনালাইসিস, এই টাইপের অফিসের কাজ নিজে নিজে করতে পারে।

ব্যাস, ওয়াল স্ট্রিট প্যানিকড। হিসাবটা খুব সিম্পল ছিলো, একটা এজেন্ট যদি পাঁচজনের কাজ করে, তাহলে কোম্পানি পাঁচটা সিট কেনো কিনবে? একটা কিনলেই তো হয়।

ফলাফলঃ

  • ২০২৫ এর অক্টোবরের পিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত S&P 500 এর সফটওয়্যার ইনডেক্স থেকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া।
  • মার্চের শেষে Atlassian প্রায় ৫৮% নিচে, Workday আর HubSpot প্রায় ৪০% নিচে, Adobe ৩০% এর বেশী।
  • ২০২৬ এর প্রথম কোয়ার্টার ছিলো গত ত্রিশ বছরে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ভ্যালুর জন্য সবচেয়ে খারাপ কোয়ার্টার।

মিডিয়া এর নাম দিলো "SaaSpocalypse"।

শুধু শেয়ারের দাম না, কিছু রিয়েল সিগনালও ছিলো। Atlassian তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এন্টারপ্রাইজ সিট কমে যাওয়ার রিপোর্ট দিয়েছে। Workday তাদের ৮.৫% কর্মী ছাটাই করে, আর পার সিট থেকে সরে "Flex Credits" নামে খরচ অনুযায়ী পেমেন্টের মডেলে যাওয়া শুরু করে।

তব্দা খাওয়ার মতো অবস্থা।

এক এজেন্ট, পাঁচটা চেয়ার খালিঃ

একটু ভেঙ্গে বলি, পার সিট মডেলটা কেনো এতো ঝুঁকিতে।

ধরুন, একটা কোম্পানির কাস্টমার সাপোর্টে ১০ জন মানুষ কাজ করে। প্রত্যেকে একটা সাপোর্ট সফটওয়্যারের সিট ইউজ করে, প্রতি সিট মাসে ধরেন ১০০ ডলার। মাসে ১,০০০ ডলার যায় ওই SaaS কোম্পানির পকেটে।

এখন কোম্পানি একটা এআই এজেন্ট বসালো যেটা বেশীরভাগ সাধারন টিকেট নিজেই সলভ করে। ১০ জনের যায়গায় এখন ৩ জন মানুষ লাগে, বাকিটা এজেন্ট সামলায়। সিট লাগছে ৩টা। SaaS কোম্পানির ইঙ্কাম ১,০০০ থেকে নেমে ৩০০।

মজার ব্যাপার হলো, কাজ কিন্তু কমে নি। বরং বেড়েছে। কিন্তু টাকা দেয়া হচ্ছে চেয়ার গুনে, আর চেয়ার খালি।

এটাকেই বলে "সিট কম্প্রেশন"।

তাহলে SaaS মরে নি কেনো?

এবার আসি আসল টুইস্টে।

৬ অক্টোবর রয়টার্স রিপোর্ট করেছে, আমেরিকার সফটওয়্যার স্টকগুলো আবার ২০২৬ এর সর্বোচ্চ লেভেলে। জুলাই-সেপ্টেম্বর কোয়ার্টারে সফটওয়্যার ইনডেক্সের যে উত্থান হয়েছে, সেটা ২০২০ সালের পর সবচেয়ে বড়। এনালিস্টরা এখন বলছেন, এআই দিয়ে SaaS ধ্বংসের ভয়টা অনেকটাই বাড়িয়ে বলা হয়েছিলো।

কেনো এমন হলো? আমার কাছে কয়েকটা কারন মনে হয়ঃ

  • রেভিনিউ আসলে কমে নিঃ শেয়ারের দাম পরেছে ভবিষ্যতের ভয়ে, কিন্তু বেশীরভাগ কোম্পানির ইঙ্কাম বাড়ছিলোই। ক্র্যাশ হয়েছে ভ্যালুয়েশন আর গ্রোথের আশা। পাবলিক SaaS কোম্পানিগুলোর গ্রোথ ২০২১ এ ছিলো ২৭%, ফেব্রুয়ারিতে সেটা নেমে ১০%। ধীর, কিন্তু মৃত না।
  • এআই অনেক যায়গায় রিপ্লেস না, এড করছেঃ কোম্পানিগুলো রাতারাতি Salesforce বা Jira ফেলে দিয়ে নিজের এআই সিস্টেম বানায় নি। বরং ওই সফটওয়্যারের ভেতরেই এআই ফিচার ইউজ করা শুরু করেছে। এআই এক্সপেরিমেন্ট থেকে রিয়েল কাজে আসছে, আর সেই কাজ চলছে পুরানো প্ল্যাটফর্মের উপর দিয়েই।
  • ডাটা আর ওয়ার্কফ্লো রাতারাতি সরে নাঃ দশ বছরের কাস্টমার ডাটা, হাজারটা ইন্টিগ্রেশন, কোম্পানির পুরো প্রসেস যে সফটওয়্যারের উপর দাড়িয়ে, সেটা এক সাপ্তাহে বদলানো যায় না। এজেন্টের নিজেরও তো কাজ করার জন্য ডাটা লাগে, আর সেই ডাটা থাকে ওই SaaS এর ভেতরেই।
  • SaaS কোম্পানিগুলো নিজেরাই বদলাচ্ছেঃ এটাই সবচেয়ে বড় কারন, পরের পয়েন্টে বলছি।

খোলস পাল্টানোঃ সিট থেকে কাজের হিসাব

SaaS মরছে না, মরছে পার সিট মডেল। আর কোম্পানিগুলো সেটা বুঝে গেছে।

এপ্রিলে ৩০০ জন SaaS সিইও এর উপর একটা সার্ভে হয়েছে। ৯৭% বলেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে তারা পার সিট প্রাইসিং থেকে সরে আসবেন। মজার ব্যাপার, ওই একই সার্ভেতে ৯৪% বলেছেন এই মুহুর্তে পার সিট মডেল তাদের প্রোডাক্টের সাথে ঠিকঠাক মিলে। মানে, এখন কাজ করছে, কিন্তু সামনে করবে না, এটা সবাই জানে।

নতুন মডেলগুলো মোটামুটি এরকমঃ

  • ইউসেজ বেজডঃ যতো ইউজ, ততো বিল। এপিআই কল, এজেন্টের এক্টিভিটি, প্রসেস করা ডাটা, এগুলো গুনে টাকা।
  • আউটকাম বেজডঃ কাজ হলে টাকা। Intercom তাদের এআই এজেন্টের জন্য প্রতিটা সলভ হওয়া টিকেটে ০.৯৯ ডলার নেয়। Salesforce এর Agentforce নেয় এজেন্টের প্রতিটা কনভারসেশন গুনে।
  • হাইব্রিডঃ একটা বেস ফি বা কিছু সিট, তার উপর ইউসেজের বিল। ২০২৬ এ এটাই সবচেয়ে কমন হয়ে দাড়াচ্ছে।

সহজ কথায় বললে, আগে টাকা নিতো "কয়জন মানুষ বসে আছে" দেখে। এখন নিচ্ছে "কতো কাজ হলো" দেখে। চেয়ার খালি হোক সমস্যা নাই, কাজ হলেই বিল।

কারা হারছে, কারা টিকে যাবেঃ

সব SaaS এর অবস্থা এক না। যতোটুকু বুঝলাম, মোটামুটি এরকম ভাগ হচ্ছেঃ

  • পাতলা টুলগুলো সবচেয়ে বিপদেঃ যে প্রোডাক্ট মুলত একটা সুন্দর ইউআই, পেছনে তেমন কিছু নাই, যেমন ডাটা এন্ট্রি, টাস্ক ট্র্যাকিং, সিম্পল সিআরএম, বেসিক টিকেটিং, এগুলোকে একটা এজেন্ট সরাসরি ডাটার সাথে কথা বলে বাইপাস করে ফেলতে পারে। এইচটিএমএল এর কঙ্কাল কে রংচং মাখিয়ে মাসে মাসে টাকা নেয়ার দিন শেষ।
  • যাদের হাতে ডাটা আছে তারা নিরাপদঃ যে প্ল্যাটফর্মে কোম্পানির আসল ডাটা থাকে, এজেন্টকে সেখানে আসতেই হবে। ডাটা যার, এজেন্টের যুগে চাবিও তার।
  • নিশ প্রোডাক্টগুলো টিকে যাবেঃ একটা নির্দিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির গভীর সমস্যা সলভ করে এমন প্রোডাক্ট, যেমন ল ফার্ম বা হাসপাতালের জন্য বানানো সফটওয়্যার, সেখানে জেনেরিক এজেন্ট সহজে ঢুকতে পারে না। ডোমেইন নলেজটাই এখানে দেয়াল।
  • বড়রা ছোটদের কিনে ফেলছেঃ কনসলিডেশন শুরু হয়ে গেছে। ২০ অক্টোবর Salesforce প্রায় ৫.৬৬ বিলিয়ন ডলারে Braze কে কিনে নেয়ার চুক্তি করেছে। Braze ভালো কোম্পানি, গ্রোথও ভালো, কিন্তু আলাদা একটা টুল হিসেবে না থেকে একটা বড় প্ল্যাটফর্মের অংশ হয়ে গেলো। সামনে এরকম আরো দেখবো, শিউর।

আমাদের জন্য শিক্ষাঃ

এবার আসি আমাদের কথায়। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই এখন নিজের SaaS প্রোডাক্ট বানানোর চেস্টা করছেন, কেউ ক্লায়েন্টের জন্য বানাচ্ছেন, কেউ মাইক্রো SaaS দিয়ে সাইড ইঙ্কামের স্বপ্ন দেখছেন। আমি নিজেও প্রোডাক্ট বানাই। কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখা জরুরি মনে হয়ঃ

  • "আরেকটা টুডু এপ" বানানোর আগে দুইবার ভাবুনঃ যে কাজ একটা এজেন্ট কয়েক লাইনের প্রম্পটে করে ফেলতে পারে, সেটার জন্য মানুষ মাসে মাসে টাকা দিবে কেনো? প্রোডাক্টের ভেতরে এমন কিছু রাখুন যেটা কপি করা কঠিন। নিজের ডাটা, নির্দিষ্ট একটা নিশের গভীর বোঝা, বা এমন ইন্টিগ্রেশন যেটা বানাতে আসলেই ঘাম ঝরাতে হয়।
  • প্রাইসিং নিয়ে শুরু থেকেই চিন্তা করুনঃ এআই ফিচার থাকলে প্রতিটা রিকোয়েস্টে আপনার নিজের খরচ আছে, এপিআই এর বিল। ফিক্সড পার সিট প্রাইস দিয়ে বসে থাকলে দেখা যাবে একজন হেভি ইউজার মাসে যতো টাকা দেয়, তার চেয়ে বেশী টাকা খায়। বেস ফি + ইউসেজ, এই টাইপের হাইব্রিড মডেল দিয়ে শুরু করাই বেটার।
  • এজেন্টকে শত্রু না, কাস্টমার ভাবুনঃ সামনে আপনার প্রোডাক্ট শুধু মানুষ ইউজ করবে না, এজেন্টও করবে। ভালো এপিআই, পরিস্কার ডকুমেন্টেশন, MCP সাপোর্ট, এগুলো থাকলে এজেন্টরা আপনার প্রোডাক্ট ইউজ করবে, বাইপাস করবে না।
  • ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও একই কথাঃ ক্লায়েন্ট এখন শুধু "একটা ড্যাশবোর্ড বানিয়ে দেন" বলবে না, বলবে "এটার সাথে এআই কিভাবে কাজ করবে?" এই প্রশ্নের উত্তর যার কাছে আছে, মার্কেট তার।

উপসংহারঃ

ফেব্রুয়ারির প্যানিকটা পুরোপুরি ভুল ছিলো না, আবার পুরোপুরি ঠিকও ছিলো না। SaaS মরে নি, কিন্তু যে মডেলে SaaS বিশ বছর ধরে আরামে টাকা কামিয়েছে, সেই "চেয়ার গুনে ভাড়া" মডেলের দিন শেষের দিকে। যা রটে, তা একটু হলেও ঘটে।

তবে হ্যা, খেলা এখনো শেষ না। কিছু এনালিস্ট বলছেন, আসল পরীক্ষা আসবে ২০২৭ এর দ্বিতীয় ভাগে, যখন আরো ডাটা সেন্টার চালু হবে আর এআই দিয়ে নিজেই সফটওয়্যার বানিয়ে নেয়া আরো সস্তা হয়ে যাবে। শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু, যারা খোলস পাল্টাতে পারবে তারা টিকে যাবে, আর যারা পুরানো খোলস আঁকড়ে ধরে বসে থাকবে, তারা মুখ থুবরে পরবে।

আপনি কি নিজের কোন SaaS প্রোডাক্ট বানাচ্ছেন? প্রাইসিং নিয়ে কি ভাবছেন? নিচে কমেন্টে জানাবেন। ভুল-ভ্রান্তি নিজগুনে ক্ষমা করবেন। শুভকামনা রইলো।

পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

    এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনার হোক!

    আরও পড়ুন

    ব্যবসা এর সব পোস্ট

    স্ট্রাইপ কেনো OpenRouter কিনলো, আর বাংলাদেশী ডেভেলপারদের জন্য এর মানে কি?

    ৭ মিনিট

    স্ট্রাইপ OpenRouter কিনে নিলো। OpenRouter আসলে কি, পেমেন্ট আর মডেল রাউটিং কেনো এক হলো, আর বাংলাদেশী ডেভেলপারদের লাভ-ক্ষতি কোথায়।

    স্ট্রাইপ কেনো OpenRouter কিনলো, আর বাংলাদেশী ডেভেলপারদের জন্য এর মানে কি?

    কিভাবে বাংলাদেশ থেকে ইউএস বিজনেস রেজিস্টার করবেন?

    ৭ মিনিট

    বাংলাদেশ থেকে অনলাইন বেজড ওভারসিজ বিজনেস করা প্রায় অসম্ভব। প্রোডাক্ট সেল হোক আর সার্ভিস সেল হোক, বাংলাদেশ থেকে ভালো বিজনেস মডেল সাজানো প্রায় অনেক ক্ষেত্রে…

    কিভাবে বাংলাদেশ থেকে ইউএস বিজনেস রেজিস্টার করবেন?

    ট্যাগ